ধারাবাহিক উপন্যাস: কনক্রিটের মরূদ্যান
মুফতী খালেদ সাইফুল্লাহ আল-হুসাইনী
পর্ব: ০৩ — ছাদের সবুজ বিপ্লব ও হারানো সেতুবন্ধন
শুক্রবারের সেই ছাদ বৈঠকের পর যেন এক নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে দশ তলার ওই অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংটিতে। এতদিন যে মানুষগুলো একে অপরকে অচেনার মতো এড়িয়ে চলত, ছাদের সেই ছোট্ট জমায়েত তাদের মনে এক সুপ্ত আশার বীজ বুনে দিয়েছিল। মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেব বিশ্বাস করতেন যে, সমাজ পরিবর্তনের এই ছোট্ট পদক্ষেপগুলোই একদিন বড় কোনো বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে তুলবে।
পরের সপ্তাহের এক ছুটির দিনে সায়েদ ও রাহাত বেশ কিছু মাটির টব, বীজ এবং চারাগাছ নিয়ে হাজির হলো বিল্ডিংয়ের ছাদে। তাদের সাথে যোগ দিল ফ্লোরের আরও কয়েকজন তরুণ ও শিশু। কংক্রিটের নিষ্ঠুর ধূসরতাকে পেছনে ফেলে ছাদের এক কোণে গড়ে তুলতে হবে একটি ‘সবুজ মরূদ্যান’।
ইসলাম ধর্মে প্রকৃতি রক্ষা এবং বৃক্ষরোপণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বৃক্ষরোপণের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন—
“কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল বুনে, আর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা চতুষ্পদ প্রাণী ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।” (সহিহ বুখারি: ২৩২০)
মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেব চায়েদ কাপ হাতে ছাদের সিঁড়িতে এসে দাঁড়ালেন। তরুণদের উৎসাহ দেখে তার দুই চোখের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি এগিয়ে গিয়ে একটি ছোট জলপাই গাছের চারা নিজের হাতে মাটিতে রোপণ করে বললেন, “বাবারা, গাছ লাগানো কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, এটি একটি সদকায়ে জারিয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম পানির সংকট কিংবা কষ্টের মাঝেও গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের যত্ন নিতেন। হিজরতের পর মদিনার মরুময় মাটিতে কীভাবে খেজুর বাগান ও সবুজের সমারোহ গড়ে তোলা হয়েছিল, তা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা।”
সায়েদ মাটিমাখা হাতে ঘাম মুছতে মুছতে বলল, “হুজুর, আমরা ভাবছি শুধু গাছ লাগিয়েই ক্ষান্ত হব না। প্রতি ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের যে জৈব বর্জ্য বা অবশিষ্টাংশ ফেলে দেওয়া হয়, তা দিয়ে কীভাবে সার তৈরি করা যায়, তার একটা পরিকল্পনা করছি। এতে ছাদের বাগানও উর্বর হবে, আবার ফ্ল্যাটগুলোর নোংরাও কমবে।”
রাহাত তার কথার রেশ ধরে যোগ করল, “আর হ্যাঁ, বাচ্চাদের জন্যও এটা দারুণ একটা সুযোগ। সারাদিন ভিডিও গেম আর মোবাইল স্ক্রিনে বন্দি থাকা এই শিশুরা এখন অন্তত বিকেলবেলা গাছের পরিচর্যা করতে ছাদে আসবে, প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাবে।”
ইতিহাসের সোনালী যুগে সাহাবিরা যেভাবে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে সমাজের কল্যাণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তারই যেন এক আধুনিক রূপ দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল এই ছাদটিতে। যে ফ্ল্যাটগুলোর দরজা সবসময় বাইরে থেকে লক করা থাকত, আজ সেই দরজাগুলো একে অপরের প্রয়োজনে খুলতে শুরু করেছে। ছাদের বাগান পরিচর্যার বাহানায় পাশের ফ্ল্যাটের ভাবিরা দুপুরের রান্না শেয়ার করা শুরু করলেন, প্রবীণ বৃদ্ধরা একচিলতে রোদে চেয়ার পেতে বসা শুরু করলেন।
সন্ধ্যা নামল কংক্রিটের এই মরূদ্যানের বুকে। শহরের হাজারো নিয়ন আলোর ভিড়েও ওই দশ তলার ছাদটি থেকে যেন এক অন্যরকম স্নিগ্ধ আলো ছড়াচ্ছিল—যে আলো মানবিকতার, যে আলো ভালোবাসার।
মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেব নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে জায়নামাজে বসে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, ইটের এই খাঁচাগুলো মানুষের মনকে পাথুরে করে তুলতে পারে, কিন্তু যদি সেখানে ঈমান ও মানবতার পরশ বুলিয়ে দেওয়া যায়, তবে পাথর ভেদ করেও সবুজের অঙ্কুরোদগম হতে বাধ্য।
(চলবে...)

0 মন্তব্যসমূহ