ধারাবাহিক উপন্যাস: কনক্রিটের মরূদ্যান
মুফতী খালেদ সাইফুল্লাহ আল-হুসাইনী
পর্ব: ০৪ — দ্বারে দ্বারে সান্ত্বনা ও পারস্পরিক অধিকারের পাঠ
ছাদের সেই সবুজ উদ্যোগ এবং ছোটোখাটো আড্ডাগুলো ধীরে ধীরে দশ তলার ওই অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের মধ্যকার দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে এনেছিল। মানুষ এখন বুঝতে শুরু করেছে যে, কেবল নিজের ফ্ল্যাটের চার দেওয়ালের ভেতর সুখ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, যদি প্রতিবেশীর ঘরের কষ্ট বা কান্নার আওয়াজ কানে না পৌঁছায়।
একদিন বিদেশের একটি নামী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা তরুণ প্রকৌশলী ফুয়াদ এসে উপস্থিত হলো মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেবের ফ্ল্যাটে। ফুয়াদ এতদিন ভীষণ অহঙ্কারী ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন করত। কারো সাথে ঠিকমতো কথা পর্যন্ত বলত না। কিন্তু ছাদের বাগানের কাজ এবং বৃদ্ধ প্রতিবেশীর সেবায় সায়েদ ও রাহাতের আন্তরিকতা তার ভেতরের পাথর ভেদ করে দাগ কেটেছিল।
— "আসসালামু আলাইকুম হুজুর," ফুয়াদের মাথা কিছুটা নিচু, গলায় এক ধরনের বিনয়, "একটা বিষয় নিয়ে আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাচ্ছিলাম। আমাদের এই বিল্ডিংয়ে মোট কুড়িটি ফ্ল্যাট আছে। আমরা যদি কেবল নিজেদের নিয়ে মেতে থাকি, তবে তো সমাজের আসল রূপ দেখতে পাব না। আমাদের ফ্লোরের ঠিক নিচেই একটি পরিবার থাকে, যাদের কর্তা সম্প্রতি চাকরি হারিয়েছেন। লোকটা লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে পারছেন না, অথচ তাদের ঘরে খাবার পর্যন্ত ফুরিয়ে এসেছে। আমি তো এতদিন এসব খেয়ালই করতাম না।"
মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেব মুচকি হেসে ইশারা করলেন তাকে বসতে। ইসলামি সমাজব্যবস্থার মূল ভিত্তি যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও গোপন সহায়তা, তা ফুয়াদকে বোঝানোর জন্য এটিই ছিল উপযুক্ত সময়।
মুফতী সাহেব শান্ত কণ্ঠে বললেন, "ফুয়াদ বাবা, তুমি খুব সময়োপযোগী একটি বিষয় তুলেছ। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে শুধু নিজের পেট পুরে খাওয়া নয়, বরং প্রতিবেশীর ক্ষুধা নিবারণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—‘সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় আর তার প্রতিবেশী তার পাশেই না খেয়ে থাকে, অথচ সে তা জানে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ: ১১২)"
ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, “মদিনা হিজরতের পর আনসার সাহাবিরা যেভাবে নিজেদের সহায়-সম্পদের অর্ধেক মুহাজির ভাইদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তা কোনো সাধারণ দানশীলতা ছিল না; তা ছিল আত্মত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা। খলিফা হজরত উমর ফারুক ((রা.)) রাতের আঁধারে পিঠে আস্তার বস্তা বহন করে শহরের দরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিতেন, কেউ যেন চিনতে না পারে। কারণ তিনি জানতেন, মানুষের ইজ্জত ও সম্মান রক্ষা করাও একজন মুমিনের দায়িত্ব।”
ফুয়াদের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সে বুঝতে পারল, আধুনিকতার ছদ্মবেশে মানুষ যতই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠুক না কেন, অন্তরের ভেতর সেই ইব্রাহিমি মিল্লাতের ত্যাগের চেতনা আজও বেঁচে আছে।
সে দৃঢ়স্বরে বলল, "তাহলে হুজুর, আমরা কি একটি ছোট উদ্যোগ নিতে পারি না? আমাদের এই বিল্ডিংয়ের সবাই মিলে যদি একটি ফান্ড বা পারস্পরিক সহযোগিতার বাক্স তৈরি করি, যেখান থেকে গোপনে সংকটে থাকা পরিবারগুলোকে সাহায্য করা যাবে?"
মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেব তার কাঁধে হাত রেখে উৎসাহ দিয়ে বললেন, "অবশ্যই! এটি অত্যন্ত চমৎকার একটি উদ্যোগ। ইসলামে গোপন দানের অনেক মর্যাদা রয়েছে, যা আল্লাহর রাগ দমন করে এবং সমাজে ভালোবাসার সেতু তৈরি করে।"
পরের দিনই সায়েদ, রাহাত ও ফুয়াদকে নিয়ে একটি গোপন ও মার্জিত সহায়তা কমিটি গঠিত হলো। কাউকে ছোট না করে, অত্যন্ত সম্মানের সাথে সেই বেকার প্রতিবেশীর হাতে ত্রাণের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হলো। যখন ওই মানুষটির চোখে কৃতজ্ঞতার জল দেখা গেল, তখন ফুয়াদ অনুভব করল—ব্যাংক ব্যালেন্স বা বিলাসবহুল গাড়ি মানুষকে প্রকৃত শান্তি দেয় না; বরং একটি ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মাঝে যে শান্তি রয়েছে, তা কোটি টাকা খরচ করেও পাওয়া যায় না।
কংক্রিটের এই মরূদ্যানের একেকটি ফ্ল্যাট থেকে যেন এবার মনুষ্যত্ব ও মানবতার সুবাস ছড়াতে শুরু করল। মানুষ বুঝতে পারল, সমাজ বদলানোর জন্য বড় কোনো রাজনীতির প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন কেবল নিজের পাশের মানুষটির হাত শক্ত করে ধরে রাখার সৎ সাহসের।
(চলবে...)

0 মন্তব্যসমূহ