Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ধারাবাহিক উপন্যাস: কনক্রিটের মরূদ্যান

 ধারাবাহিক উপন্যাস: কনক্রিটের মরূদ্যান


মুফতী খালেদ সাইফুল্লাহ আল-হুসাইনী



পর্ব: ০৫ — প্রবীণের নিঃসঙ্গতা ও ইশারার আলো

দশ তলার ওই অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ সবুজ হয়ে ওঠার পর এবং গোপন সহযোগিতার বাক্সটি চালু হওয়ার পর থেকেই যেন বাতাস বদলাতে শুরু করেছিল। মানুষ এখন আর আগের মতো উদাসীন নয়; লিফটে দেখা হলে কিংবা সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় একে অপরের দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দেওয়া বা কুশল বিনিময় করা এখন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

তবে এই বদলের ঢেউ তখনও স্পর্শ করতে পারেনি দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটটিকে। সেখানে থাকেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হারুন সাহেব। বয়স সত্তরের কোঠায়। স্ত্রী মারা গেছেন কয়েক বছর আগে, একমাত্র ছেলে উচ্চশিক্ষার সুবাদে সুদূর আমেরিকায় থিতু হয়েছে। বাবার খোঁজ নেওয়ার ফুরসত তার হয় না বললেই চলে। হারুন সাহেবের পুরো পৃথিবীটা বন্দি হয়ে আছে তার ওই অন্ধকার ফ্ল্যাটের চার দেওয়ালে। বাইরে কি হচ্ছে, কে বাঁচল আর কে মরল—তাতে তার যেন কোনো মাথাব্যথা নেই। ক্ষোভ আর অভিমান জমাট বেঁধে তার মনটাকে আরও বেশি পাথুরে করে তুলেছিল।

এক শুক্রবার সকালে মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেব বাসা থেকে বের হয়ে মসজিদে যাওয়ার সময় লক্ষ করলেন, হারুন সাহেবের ফ্ল্যাটের সামনে খবরের কাগজ ও ময়লার প্যাকেট গত দুই দিন ধরে ঠিক সেভাবেই পড়ে আছে। দরজায় কড়া নাড়লেন তিনি। অনেকক্ষণ পর দরজা খুললেন হারুন সাহেব। তার মুখ শুকনো, চোখে ক্লান্তির ছাপ এবং শরীরে জ্বর ও দুর্বলতা স্পষ্ট।

— "আসসালামু আলাইকুম হারুন ভাই," মুফতী সাহেব চিন্তিত কণ্ঠে বললেন, "আপনার কি শরীর খারাপ? গত দুদিন ধরে আপনাকে বাইরে দেখিনি, দরজাও খোলেননি।"

হারুন সাহেব ম্লান হেসে কোনোমতে বললেন, "ওয়ালাইকুমুস সালাম মুফতী সাহেব। বয়স হয়েছে, শরীরে নানা রকম চড়াই-উতরাই লেগেই থাকে। এই বয়সে অসুস্থ হলে দেখার মতো কেউ নেই। ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করেই তো পড়ে থাকি, কে আর খবর রাখবে!" তার গলায় ঝরে পড়ছিল এক বুক জমে থাকা অভিমান ও একাকীত্বের কষ্ট।

ইসলাম সবসময় প্রবীণদের সম্মান ও অধিকারের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে। ইসলামের সোনালী ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বয়োবৃদ্ধ অমুসলিম এক অন্ধ ভিক্ষুককে নিজ ঘরের দরজায় দেখে কারণ জিজ্ঞেস করেছিলেন এবং তার জীবনযাপনের সমস্ত দায়িত্ব বায়তুল মাল থেকে বহন করার ব্যবস্থা করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—

“সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না।” (সুনান আত-তিরমিজি: ১৯১৯)

মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেব হারুন সাহেবের কাঁধে সান্ত্বনার হাত রেখে স্নেহের সুরে বললেন, "হারুন ভাই, পরিবার দূরে থাকুক আর কাছের হোক, আমরা তো আপনার আশপাশেই আছি। একজন মুসলিম ও প্রতিবেশী হিসেবে আপনার খোঁজ নেওয়া আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। নবী করিম (সা.) প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি তাগিদ দিয়েছেন যে, তিনি আশঙ্কা করেছিলেন প্রতিবেশীকে হয়তো ওয়ারিশ বানিয়ে দেওয়া হবে।"

হারুন সাহেবের পাথরে জমাট বাঁধা মনটা যেন এই প্রথম একটু গলতে শুরু করল। এত বছর পর কেউ তাকে আপন মানুষের মতো সান্ত্বনা দিল, খোঁজ নিল।

ঠিক তখনই নিচতলায় সায়েদ, রাহাত ও ফুয়াদ খবর পেয়ে ছুটে এল। হাতে গরম স্যুপ আর কিছু জরুরি ওষুধ। ফুয়াদ লজ্জিত কণ্ঠে বলল, "কাকু, আমরা সত্যিই ক্ষমাপ্রার্থী। এতদিন আমরা নিজেদের কাজে এত ব্যস্ত ছিলাম যে আপনার মতো একজন প্রবীণ মানুষ আমাদের এত কাছে থেকেও কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন, তা খেয়ালই করিনি।"

হারুন সাহেবের শুষ্ক চোখ দিয়ে অজান্তেই এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি বুঝলেন, কংক্রিটের এই নিষ্ঠুর মরূদ্যানের দেয়ালে শুধু ইট-সিমেন্ট আর ইমারতই তৈরি হয় না, মানুষের মনের নিখাদ ভালোবাসার ছোঁয়ায় সেখানে আস্থার এক সুরক্ষাবলয়ও তৈরি করা সম্ভব।

সেদিনের পর থেকে হারুন সাহেবের ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতা কেটে গেল। প্রতিদিন সকালে সায়েদ বা রাহাত অফিসে যাওয়ার আগে একবার তার খোঁজ নিয়ে যায়, আর বিকেলে মুফতী সাহেব তার সাথে বসে কিছুক্ষণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক আলোচনা করেন। প্রবীণ মানুষটির মুখে আবার হাসি ফুটল।

ইটের খাঁচায় বন্দি যান্ত্রিক শহরটা ধীরে ধীরে যেন এক জীবন্ত পরিবারে রূপ নিতে শুরু করল—যেখানে বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান আর ছোটদের প্রতি স্নেহ সমাজ বদলের নতুন ইতিহাস রচনা করছে।



(চলবে...)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ