Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ধারাবাহিক উপন্যাস: কনক্রিটের মরুদ্যান

ধারাবাহিক উপন্যাস: কনক্রিটের মরূদ্যান 

 মুফতী খালেদ সাইফুল্লাহ আল-হুসাইনী 

পর্ব: ০১ — 



ইটের খাঁচায় নিশ্পেষিত প্রাণ ও ইব্রাহিমি মিল্লাতের খোঁজ

শহরের সকাল শুরু হয় পাখির ডাকে নয়, বরং ভারী যানবাহনের হর্ন, লিফটের শোঁ শোঁ শব্দ আর কংক্রিটের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত যান্ত্রিক কোলাহলে। দিগন্তজোড়া খোলা আকাশ এখানে বড়ো এক বিলাসিতা; বহু তলা ভবনের খাঁচায় বন্দি এখানকার মানুষের আকাশ দেখার সুযোগ হয় শুধু ফ্ল্যাটের সংকীর্ণ বারান্দা বা মুঠোফোনের নীলচে স্ক্রিনে। এই অপরিসর যান্ত্রিক নগরায়ণকেই মানুষ আধুনিকতার নাম দিয়েছে, অথচ আত্মার খোরাক হারিয়ে এই শহর যেন আজ এক জীবন্ত মরুভূমি—‘কনক্রিটের মরূদ্যান’।

বহুতল এক অ্যাপার্টমেন্টের দশম তলার ফ্ল্যাটে বসে আনমনে কফি কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেব। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে এই ইট-পাথরের শহরে তিনি যেন হাঁপিয়ে উঠেছেন। চারপাশের ফ্ল্যাটে শত শত মানুষ বাস করে, অথচ কারো সাথে কারো মনের মিল নেই। পাশের দরজায় কে থাকে, সে খবর নেওয়ার ফুরসত বা আগ্রহ—দুটোই হারিয়ে গেছে।

আইনুল আরেফীন সাহেবের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়। মদিনার সেই ছোট্ট জনপদ, যেখানে আনসার ও মুহাজিররা নিজেদের ঘরের অর্ধেক সম্পত্তি অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুরা আল-হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে আনসারদের সেই ত্যাগের মহিমা কত সুন্দরভাবেই না তুলে ধরেছেন:

“আর যারা মদিনাকে ইতিপূর্বে বসবাসস্থল হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল, তারা নিজেদের চেয়ে অভাবগ্রস্তদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তাদের নিজেদের রয়েছে তীব্র অভাব।” [আল-হাশর: ৯]

অথচ আজ এই তথাকথিত আধুনিক সমাজে মানুষ নিজের ফ্ল্যাটের দরজা তালাবদ্ধ করে পাশের ফ্ল্যাটের অনাহারী বা অসুস্থ মানুষের খবরও রাখে না।

আইনুল আরেফীন সাহেবের ভাবনার ছেদ ঘটে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে। দরজা খুলতেই দেখা গেল প্রতিবেশী তরুণ সায়েদ দাঁড়িয়ে আছে। সায়েদের চেহারায় এক ধরনের ক্লান্তি আর হতাশার ছাপ। সায়েদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে।

— "আসসালামু আলাইকুম হুজুর," ম্লান হেসে সায়েদ বলে, "একটা সমস্যায় পড়েছি। আমাদের ফ্লোরের শেষ ফ্ল্যাটের বৃদ্ধ চাচা গত দুদিন ধরে অসুস্থ, ঘরে কোনো খাবার নেই, একা মানুষ—কেউ খোঁজ নেয়নি। অফিসে যাওয়ার পথে খেয়াল করলাম। আমি তো সারাদিন বাইরে থাকি, একটু যদি..."

সায়েদের কথা শেষ হওয়ার আগেই আইনুল আরেফীন সাহেবের মনে পড়ে গেল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই বিখ্যাত বাণী। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

“যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবী মুসিবত দূর করে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার মুসিবত দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো বিপগ্রস্ত মানুষের কষ্ট লাঘব করে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার কষ্ট সহজ করে দেবেন।” (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)

আইনুল আরেফীন সাহেবের চোখ চকচক করে ওঠে। এই তো সমাজের ক্ষত সারানোর প্রথম ওষুধ! যান্ত্রিকতার মরুভূমিতে সহমর্মিতার এক ফোঁটা বারিধারা।

তিনি সায়েদের কাঁধে হাত রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "সায়েদ বাবা, এসো! আমরা কেবল নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই তো সমাজ বদলাবে না। মহান সাহাবি হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) খলিফা হওয়ার পরও কীভাবে সাধারণ মানুষের বাড়ি গিয়ে ছাগল দোহন করে দিয়ে আসতেন, তা কি ভুলে গেছি? ইসলামের শিক্ষা তো প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া।"

সায়েদ যেন একটু শক্তি পেল। সে বুঝতে পারল, কংক্রিটের এই দেয়ালগুলো মানুষের মনকে যতই দূরে সরিয়ে রাখুক না কেন, অন্তরের ভেতর একটু মানবিকতার আলো জ্বেলে দিলেই এই মরূদ্যানকেও সবুজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তারা দুজনে মিলে দ্রুত বৃদ্ধ প্রতিবেশীর ঘরে প্রবেশ করলেন। চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং খাবারের জোগান দিয়ে যখন তারা ফিরে আসছিলেন, তখন সায়েদের মনে এক অজানা শান্তি কাজ করছিল। সে বুঝতে পারল, পরিবর্তন বাইরের কোনো বিপ্লব দিয়ে শুরু হয় না; পরিবর্তন শুরু হয় নিজের ঘরের পাশের মানুষটির হাত ধরার মধ্য দিয়ে।

ইতিহাসের সোনালী আলো আর কুরআনের শাশ্বত বাণী কি তবে আবার পথ দেখাবে এই যান্ত্রিক শহরকে? নাকি কংক্রিটের আড়ালে হারিয়ে যাবে মানবতা?

(চলবে...)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ