Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ধারাবাহিক উপন্যাস: কনক্রিটের মরূদ্যান


ধারাবাহিক উপন্যাস: কনক্রিটের মরূদ্যান


মুফতী খালেদ সাইফুল্লাহ আল-হুসাইনী




পর্ব: ০২ — ছাদের কোণে সবুজের ছোঁয়া ও পারস্পরিক মেলবন্ধন

বৃদ্ধ প্রতিবেশীর সেবা করার পরদিন সকালে মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেব নিজের ফ্ল্যাটের ছোট বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাচ্ছিলেন। চারপাশের বিশাল সব ইমারতের মাঝে মানুষের মনগুলো কেমন যেন বন্দি হয়ে আছে। ইসলাম শুধু ইবাদত-বন্দেগির নাম নয়; বরং সমাজ সংস্কার, পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করাই হলো প্রকৃত দ্বীন।

ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেরালে দেখা যায়, মদিনার হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের এক অবিস্মরণীয় বন্ধন গড়ে দিয়েছিলেন। যার ফলে একটি আদর্শ সমাজ গঠিত হয়েছিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুরা আল-আনফালের ৭২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন:

“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং হিজরত করেছে ও নিজেদের জান-মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারা একে অপরের বন্ধু।” [আল-আনফাল: ৭২]

অথচ বর্তমান আধুনিক শহরের অ্যাপার্টমেন্ট কালচারে সেই ভ্রাতৃত্ববোধ তো দূরের কথা, নিজের ফ্লোরে কে থাকে সেটাই কেউ জানে না। এই দূরত্ব ঘোচানোর জন্য কিছু একটা করা দরকার—এই ভাবনাই ঘুরপাক খাচ্ছিল মুফতী সাহেবের মনে।

ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। দরজা খুলতেই দেখা গেল সায়েদের সাথে দাঁড়িয়ে আছে এই বিল্ডিংয়ের আরেক তরুণ, নাম রাহাত। রাহাতের হাতে এক কাপ গরম চা আর কিছু কাগজ।

— "আসসালামু আলাইকুম হুজুর," রাহাত কিছুটা সংকোচ নিয়ে বলল, "কাল সায়েদের মুখে আপনাদের উদ্যোগের কথা শুনলাম। খুব ভালো লাগল। আমাদের এই দশ তলার বিল্ডিংয়ে তো কোনো যোগাযোগের মাধ্যম নেই। সবাই শুধু নিজের ফ্ল্যাট নিয়ে ব্যস্ত। আমরা কি ছোট্ট পরিসরে হলেও একটা কিছু শুরু করতে পারি না? যেমন ধরুন, প্রতি শুক্রবার বিকেলে সবাই মিলে একটু বসা বা কুশল বিনিময় করা?"

মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেবের মুখে প্রশান্তির এক মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তিনি তরুণদের উৎসাহ দিয়ে বললেন, "খুব চমৎকার আইডিয়া, রাহাত বাবা! সাহাবায়ে কেরাম তো কেবল বিপদে-আপদে নয়, নিয়মিত একে অপরের খোঁজখবর নিতেন এবং দ্বীনি ও দুনিয়াবী বিষয়ে পরামর্শ করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (সহিহ বুখারি: ১৩)"

সায়েদ উৎসাহের সাথে যোগ করল, "তাহলে হুজুর, আমরা কাজ শুরু করে দিতে পারি। আমাদের বিল্ডিংয়ের যে বিশাল ছাদটি সারাক্ষণ অব্যবহৃত পড়ে থাকে, সেখানে যদি আমরা সবাই মিলে একটা ছোট বৈঠক বা বাগান করার উদ্যোগ নিই, কেমন হয়?"

মুফতী সাহেব মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তিনি বুঝলেন, কংক্রিটের এই মরূদ্যানের বুকে পরিবর্তনের চারা রোপণ করার সময় এখনই। মানুষগুলোকে শুধু একটু এক জায়গায় আনার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিতে হবে।

পরের দিন শুক্রবার বিকেলে বিল্ডিংয়ের ছাদে সব ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক সভার আয়োজন করা হলো। প্রথমে কেউ আসতে চায়নি, কিন্তু সায়েদ ও রাহাতের আন্তরিক আহ্বানে একে একে প্রায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মানুষ বেরিয়ে এল। কেউ নিয়ে এল বসার জন্য টুল, কেউ বা সামান্য নাস্তা।

বছরের পর বছর যারা পাশাপাশি থেকেও একে অপরকে চিনত না, আজ ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে তারা একে অপরের সুখ-দুঃখের কথা শুনতে শুরু করল। মুফতী আইনুল আরেফীন সাহেব তাদের সামনে সংক্ষিপ্ত এক বক্তব্যে ইসলামের সুমহান সাম্য ও প্রতিবেশীর অধিকারের কথা তুলে ধরলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সেই বিখ্যাত বাণী—যিনি ফোরাতের তীরে না খেয়ে থাকা একটি পশুর জন্যও নিজের জবাবদিহিতার কথা ভেবে কেঁদেছিলেন।

ছাদের সেই কোণটিতে সেদিন ইটের খাঁচার বন্দিদশা ভেঙে জন্ম নিল এক নতুন মানবিক সমাজের অঙ্কুর। কংক্রিটের মরূদ্যান যেন ধীরে ধীরে সবুজের ছোঁয়া পেতে শুরু করল।



(চলবে...)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ