Header Ads Widget

Responsive Advertisement

৯০ হাজার কালাম (জাহেরি ও বাতেনি ইলম) দাবির অপনোদন ও শরয়ী বিধান

 ৯০ হাজার কালাম (জাহেরি ও বাতেনি ইলম) দাবির অপনোদন ও শরয়ী বিধান



#প্রশ্ন: অনেকে বলে থাকে যে, কালামুল্লাহ বা পবিত্র কোরআনের ইলম হলো মোট ৯০ হাজার; যার মধ্যে ৩০ হাজার হলো জাহেরি (প্রকাশ্য) এবং বাকি ৬০ হাজার হলো বাতেনি (গোপন)। তাদের দাবি, এই ৬০ হাজার বাতেনি ইলমের খবর বর্তমান আলেমসমাজ জানেন না। এ কথার সত্যতা কতটুকু? এর পক্ষে কি কোরআন-হাদিসে কোনো প্রমাণ আছে? প্রমাণ না থাকলে এই ভ্রান্ত ধারণার উৎপত্তি কোথা থেকে হলো—এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।
কালামুল্লাহ বা দ্বীনি ইলম ৯০ হাজার (যার ৩০ হাজার জাহেরি এবং ৬০ হাজার বাতেনি)—এ ধরনের কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং কুফরি আকিদার অন্তর্ভুক্ত। একশ্রেণির পথভ্রষ্ট ও নামধারী ফকিহ বা বাতেনিপন্থী ভণ্ডরা এই অপপ্রচার চালিয়ে থাকে। তাদের দাবি অনুযায়ী, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাকি একমাত্র হযরত আলী (রা.)-কেই গোপনে এই ৬০ হাজার কালাম বা বাতেনি ইলম শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং তা সাধারণ আলেমসমাজ থেকে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছে।
এই দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ইসলামবিরোধী হওয়ার পেছনে বেশ কিছু মৌলিক কারণ ও শরয়ী দলিল রয়েছে:
১. আল্লাহ তাআলার ওপর মিথ্যারোপ:
এই ধারণার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার শানে চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করা হয়। কারণ, এর দ্বারা মূলত এই বিশ্বাস করা হয় যে, আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে দুই ধরনের পরস্পরবিরোধী শরিয়ত দিয়েছেন—একটি প্রকাশ্য ত্রিশ হাজার কালামের শরিয়ত এবং অন্যটি ষাট হাজার কালামের গোপন বাতেনি শরিয়ত। অথচ ইসলামে এমন কোনো দ্বিমুখী বা পরস্পরবিরোধী বিধানের কোনো অস্তিত্ব নেই।
২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর অপবাদ:
এই ভ্রান্ত আকীদার ফলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর চরম মিথ্যা ও খিয়ানতের অপবাদ আসে। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্বীনের মৌলিক ও জরুরি বিষয়গুলো উম্মতের কাছে পরিপূর্ণভাবে পৌঁছাননি, বরং কিছু গোপন বিষয় শুধু একজনের কাছে বলে অন্যদের থেকে লুকিয়ে গেছেন। অথচ পবিত্র কোরআনে দ্বীনকে পরিপূর্ণ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
৩. সাবায়ী চক্রের প্রোপাগান্ডা:
“রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলীকে গোপনে এমন কিছু দ্বীনি কথা বলেছেন যা অন্যদের বলেননি”—এই ধারণাটি মূলত ইতিহাসের কুখ্যাত সাবায়ী চক্রের (আবদুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারী ইহুদি চক্রান্তকারীদের) তৈরি করা। হযরত আলী (রা.)-এর খেলাফতকালে যখন এই চক্র এই মিথ্যা প্রচার চালাতে শুরু করে, তখন সাহাবি ও সাধারণ মুসলমানরা সরাসরি হযরত আলী (রা.)-এর কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান। তখন তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই মিথ্যা দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
ঐতিহাসিক প্রমাণ ও হাদিস
হযরত আলী (রা.) থেকে এ বিষয়ে বহু সহিহ বর্ণনা রয়েছে। তার মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস নিচে উল্লেখ করা হলো:
এক ব্যক্তি হযরত আলী (রা.)-কে জিজ্ঞেস করল, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি মানুষের অগোচরে আপনাকে বিশেষ কিছু বলে গেছেন?”
এ কথা শুনে হযরত আলী (রা.) চরম রাগান্বিত হলেন এবং তার মুখমণ্ডল লাল হয়ে গেল। অতঃপর তিনি স্পষ্ট ভাষায় বললেন:
> مَا كَانَ يُسِرُّ إِلَيَّ شَيْئًا دُونَ النَّاسِ غَيْرَ أَنَّهُ حَدَّثَنِي بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ وَأَنَا وَهُوَ فِي الْبَيْتِ فَقَالَ لَعَنَ اللهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَهُ، وَلَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ، وَلَعَنَ اللهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا، وَلَعَنَ اللهُ مَنْ غَيَّرَ مَنَارَ الْأَرْضِ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের অগোচরে আমাকে দ্বীনের কোনো গোপন বা বিশেষ কিছু বলে যাননি। তবে তিনি আমাকে চারটি সুনির্দিষ্ট কথা বলেছেন, তখন আমি ও রাসূলুল্লাহ (সা.) উভয়েই ঘরের ভেতরে ছিলাম। তিনি ইরশাদ করেন:
১. যে ব্যক্তি তার পিতাকে লানত (অভিসম্পাত) করে, আল্লাহ তাআলা তাকে লানত করুন।
২. যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও) নামে পশু জবাই করে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর লানত করুন।
৩. যে ব্যক্তি কোনো বিদআতি বা অপরাধীকে আশ্রয় দেয়, আল্লাহ তাআলা তার ওপর লানত করুন।
৪. যে ব্যক্তি জমির সীমানা বা চিহ্ন এদিক-সেদিক করে (জবরদখল করে), আল্লাহ তাআলা তার ওপর লানত করুন।”(সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং: ৪৪৪২)
অতএব, ৯০ হাজার কালাম বা বাতেনি ইলমের এই মনগড়া তত্ত্বের পক্ষে পবিত্র কোরআন বা হাদিসে কোনো প্রমাণ নেই। এটি দ্বীনকে বিকৃত করার একটি জঘন্য অপচেষ্টা মাত্র। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে এ ধরনের কুফরি ও ভ্রান্ত ধারণা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
* সুনানে নাসায়ী: ৪/৩৭০ (হাদিস নং: ৪৪৪২, বায়রুত: দারুল মাআরিফ / দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ সংস্করণ দ্রষ্টব্য)
* সহীহ বুখারী: ২/৬১৩ (হাদিস নং: ৩১৭০)
* সহীহ মুসলিম: ২/৯৯৭ (হাদিস নং: ১৩৭০)
* সুনানে তিরমিযী: ৪/২১৩ (হাদিস নং: ২১১৮)
* মুসনাদে আহমদ: ১/১০১ (হাদিস নং: ৬৩৫)
* আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৩৬০


পশ্চিম বেজগাঁও, শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জ।
ইমাম ও খতীব: শ্রীনগর দক্ষিণ পাড়া মাঝি বাড়ী জামে মসজিদ, শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ